Popular Posts

ঐতিহ্যের সন্ধানে ভারত সফর-মাহবুবুর রহমান নোমানী

ঐতিহ্যের সন্ধানে ভারত সফর

মাহবুবুর রহমান নোমানী

ভ্রমণ মানুষের আত্মার খোরাক, আর সেই ভ্রমণ যদি হয় ইতিহাসের ধুলোমাখা পথ বেয়ে ইলমের সুতিকাগারের পানে তবে তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ইবাদত। শৈশব থেকে যে জনপদগুলোর নাম কিতাবের পাতায় পড়েছি, যাদের অমর কীর্তিতে আমাদের দ্বীনি সত্তা আজ মহিমান্বিত, সেই আকাবিরদের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি ভারত সফরের এক দুর্লভ মাহেন্দ্রক্ষণ এল ২০২৩ সালের আগস্টে। আমার অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, বড় ভাই মুফতি জিয়াউর রহমান কাসেমী একদিন বললেন-এ বছর প্রথম পরীক্ষার পর দেওবন্দে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছি। তাঁর এই পুণ্যময় সফরের কথা শুনে বিলম্ব না করে বললাম, আমিও আপনার এই সফরের সঙ্গী হতে চাই। ছাত্রজীবনের বন্ধু মুফতি বাহরুল ইসলামকে দেওবন্দের কথা জানালে সেও সানন্দে রাজি হলো। এরপর আমরা দুইজন ময়মনসিংহ থেকে ভিসার আবেদন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ, ২৩ দিন পর কাঙ্খিত ভিসা হাতে পেলাম।

একটি স্বপ্নের সূচনা

২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট, শুক্রবার রাত ১২:৪৫ মিনিটে আমরা ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চড়ে বসলাম। আমাদের পাঁচজনের এই কাফেলায় ছিলেন মুফতি জিয়াউর রহমান কাসেমী, আমি (মাহবুবুর রহমান নোমানী), মাওলানা বাহরুল ইসলাম, মুফতি আবদুল্লাহ এবং মাওলানা আরমান। পরামর্শক্রমে মুফতি জিয়াউর রহমান কাসেমীকে আমাদের ‘আমীর’ মনোনীত করা হলো। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ট্রেন চলছে আপন গতিতে। কিন্তু যমুনাব্রীজে গিয়ে একঘন্টা দাড়িয়ে থাকল। রাতের সফর আমাদের জন্য সুখকর হল না। না বাহিরের প্রকৃতি দেখতে পেলাম, না আরামের ঘুম দিতে পারলাম। পরদিন সকাল ১১টায় আমরা যশোরের বেনাপোল পৌঁছালাম। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হলো। সীমান্ত পার হওয়ার সময় আমাদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ দাবি করা হলে অনেকটা বাধ্য হয়েই তা প্রদান করতে হলো। পরিশেষে সীমানা পেরিয়ে রুপি বিনিময় করে সিএনজিযোগে আমরা বনগাঁ রেল স্টেশনে পৌঁছালাম।

ক্ষুধার তীব্রতা মেটানোর জন্য ভালো হোটেল খুঁজলেও বনগাঁর মতো হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় কাঙ্খিত মুসলিম হোটেল পেলাম না। বাধ্য হয়েই একটি সাধারণ হোটেলে আহার সম্পন্ন করলাম। তারপর সেখান থেকে শেয়ালদহ’র উদ্দেশে ট্রেনে ওঠলাম। ট্রেনের সিটে বসা দুই ভারতীয় যুবক মোদি সরকারের গুণগান এবং বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করছিল। প্রতিবাদ করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও সফরের শৃঙ্খলা ও শান্তির কথা চিন্তা করে মৌন থাকাই শ্রেয় মনে করলাম।

স্বপ্নের কলকাতা ও হাওড়া ব্রীজ

শিয়ালদহ স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, তখন আসরের সময় হয়ে গেছে। কাছের একটি মসজিদে নামাজ আদায় করে আমরা হাওড়ার উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম। জানালার পাশে বসে দু’চোখ ভরে দেখছিলাম কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পথঘাট, বিপণিবিতান আর প্রাচীন অট্টালিকা।

শৈশব থেকে শুনে আসা অখ- ভারতের সেই রাজধানী, যার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে আমাদের মিল রয়েছে, তা স্বচক্ষে দেখার সাধ মিটছিল। ইচ্ছা ছিল একটা দিন এখানে থেকে শহরটি ঘুরে দেখব, কিন্তু আমীর সাহেব বললেন “ফেরার পথে কলকাতা ঘোরা যাবে, এখন সময় নষ্ট না করাই ভালো।” অবশেষে স্থানীয় একজনের কাছ থেকে দর্শনীয় স্থানের নাম জানতে জানতে আমরা ঐতিহাসিক ‘হাওড়া ব্রিজ’ পার হলাম। বৃটিশ আমলে নাট-বল্টু ছাড়াই নির্মিত এই ব্রীজ এখনো কলকাতার গর্ব।এটি একটি ক্যান্টিলিভার সেতুÑমাঝখানে কোনো পিলার নেই। রাতে আলোকসজ্জায় সেতুটি অত্যন্ত মনোরম দেখায়।

E:\deband safar\Camera\IMG20230826200753.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230826200903.jpg

দিল্লির পথে: কষ্টের সফর ও ইতিহাসের হাতছানি

হাওড়া ব্রিজের চেয়েও হাওড়া স্টেশনের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। প্রতিদিন যেখানে প্রায় ৬০০ ট্রেন যাতায়াত করে এবং ২৬টি প্ল্যাটফর্মের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই স্টেশনে প্রবেশ করে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। আরমানের প্রচেষ্টায় টিকিট সংগ্রহ করে রাত ৯:৪৫ মিনিটে ‘নেতাজি সুভাষ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে প্রচ- ভিড়ের মধ্যে কোনোমতে আরোহণ করলাম। তিল ধারণের ঠাঁই নেই, বসার সিট পাওয়া তো সুদূর পরাহত। আরমান বলল, “হুজুর, উপরে উঠে বসুন।” তাকিয়ে দেখি সেটি মালামাল রাখার সংকীর্ণ জায়গা। অনন্যোপায় হয়ে সেই লোহার শক্ত শিঁকের ওপরই বসতে হলো। যখন ট্রেনের ঝাঁকুনিতে লোহার শিঁকগুলো শরীরে বিঁধছিল, কষ্টে মনটা ভারি হয়ে এল। ভাবছিলাম, দিল্লির এই ২৫ ঘণ্টার দীর্ঘ পথ কীভাবে পাড়ি দেব? অস্থিরতা নিয়ে দুআ পড়তে পড়তে একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।

প্রভাতের আলোয় দিল্লি ও মুঘল আবেশ

ভোরে যখন চোখ মেললাম, যাত্রীদের ভিড় কিছুটা কমেছে। জানালার পাশে বসে দুচোখ ভরে ভারতের দিগন্তজোড়া সবুজ বনানী, নদ-নদী আর লোকালয় দেখতে লাগলাম। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে হিন্দি ভাষার ওপরও কিছুটা দখল চলে এল। অবশেষে ২৫ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে যখন দিল্লি স্টেশনে পা রাখলাম, ঘড়িতে তখন রাত ১১টা।

ইতিহাসের পাতায় বারবার পড়ে আসা সেই মায়াবী দিল্লি! মুঘলদের স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্যভূমিতে পা রেখে হৃদয়ে এক অনাবিল শিহরণ জেগে উঠল। আধুনিক দিল্লির স্থাপত্য আর ইতিহাসের বাতায়নপথ দিয়ে আমি যেন অতীতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের আমীর সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন, রাতটুকু আমরা ‘নিজামুদ্দীন মারকাজে’ অতিবাহিত করব।

নিজামুদ্দীন মারকাজ ও মির্জা গালিবের সান্নিধ্য

‘নিজামুদ্দীন’ নামটা শুনতেই ক্লান্তি উবে গিয়ে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক চেতনা ফিরে পেলাম। বিশ্ব তাবলিগ জামাতের মারকাজ দেখার ব্যাকুলতা কার না থাকে! সিএনজি যোগে যাওয়ার পথে চোখে পড়ল ‘মির্জা গালিব রোড’। থমকে দাঁড়ালাম, এই কি সেই কিংবদন্তি কবি মির্জা গালিবের স্মৃতিধন্য পথ? আমীর সাহেব জানালেন, এখানেই উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের দুই দিকপাল মির্জা আসাদুল্লাহ গালিব এবং আমীর খসরুর মাজার অবস্থিত।

মারকাজে পৌঁছাতে রাত ১২টা বেজে যাওয়ায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেলাম না। পাশের একটি মসজিদে রাত কাটিয়ে ভোরে নিজামুদ্দীন মারকাজ মসজিদে ফজর আদায় করলাম। নামাজের পর বয়ান শুরু হলো, কিন্তু আমরা চারপাশটা ঘুরে দেখার কৌতূহল সংবরণ করতে পারলাম না।

E:\deband safar\Camera\IMG20230828060134.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828060132.jpg
E:\deband safar\received_834401324709174.jpeg

নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে: ভক্তি ও বিষাদ

মারকাজের পাশেই শুয়ে আছেন সুলতানুল আউলিয়া হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত ‘ডাকাত থেকে আউলিয়া’ হওয়ার গল্পটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন আল্লাহপ্রেমী এবং এক বিদুষী মহীয়সী নারীর সন্তান। ইলম অন্বেষণে তিনি মুলতান গমন করেন এবং বাবা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকারের সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। তাঁর নামেই আজ এই অঞ্চল ধন্য।

আমরা তাঁর মাজার জিয়ারতে গেলাম। প্রবেশপথে ফুলের পসরা সাজিয়ে বসে থাকা ব্যবসায়ীদের উপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে অসংখ্য কবরের সারি। কিন্তু ভক্তদের অতিরঞ্জিত ভক্তি দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। কেউ কবরে ফুল দিচ্ছে, কেউবা সিজদাবনত হচ্ছে। শিরক ও বিদআতের এই মহড়া দেখে হৃদয়ে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। সুলতানুল আউলিয়ার মাজার জিয়ারত শেষে পাশের মসজিদে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আমরা ভারাক্রান্ত মনে বেরিয়ে এলাম।

E:\deband safar\Camera\IMG20230828055406.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828055528.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828055147.jpg

সাহারানপুরের পথে: ইলমের সুতিকাগারে

নিজামুদ্দীন থেকে বিদায় নিয়ে আমরা দিল্লির স্টেশনে এলাম সাহারানপুরের টিকিট কাটতে। দিল্লি থেকে সাহারানপুর প্রায় ১৭০ কিলোমিটারের পথ। আমাদের আমীর সাহেবের নির্দেশনাÑআমরা প্রথমে সাহারানপুরের ‘মাজাহিরুল উলুম’ মাদ্রাসা জিয়ারত করব, তারপর পা বাড়াব দেওবন্দের পথে।

ট্রেন যখন দেওবন্দ স্টেশন অতিক্রম করছিল, মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল ওখানেই নেমে পড়তে। কিন্তু সফরের শৃঙ্খলা রক্ষায় আমীরের সিদ্ধান্তই শিরোধার্য। মনে পড়ে গেল ইতিহাসের সেই অধ্যায়Ñ দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় মাস পরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর। মাওলানা আহমদ আলী সাহারানপুরি, মাজহার নানুতবি এবং ফকিহ সাআদাত আলীর হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের দ্বীনি শিক্ষার এক অবিস্মরণীয় পাদপীঠ। আমরা মাদরাসায় প্রবেশ করে প্রথমে মেহমানখানায় গেলাম। হাত-মুখ ধূয়ে এসে দেখি দস্তরখানে খাবার প্রস্তুত। মহিষের গোস্তমিশ্রিত ডাল আর রুটি। খাদেম বলল, রাতে বিরিয়ানি পাকানো হবে। আমরা যেন রাতের খাবার গ্রহণ করি। আমরা খানা খেয়ে ঘুরে ঘুরে মাদরাসা দেখলাম। উস্তাদগণের সাথে সাক্ষাত করে দোয়া ও হাদিসের ইজাযত নিলাম। মুফতি আবু তাহের গাজিয়াবাদীর কথা উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি আমাদেরকে আবুদাউদ শরিফ এবং তিরমিজি শরিফের ইজাযত দিলেন এবং নিজের লেখা বই হাদিয়া দিয়ে কৃতার্থ করেন। সেখানে আমরা শাইখুল হাদিস জাকারিয়া (রহ.) এর বাসা পরিদর্শন করি। দ্বিতলাবিশিষ্ট বাসাটির নীচতলায় বর্তমানে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

E:\deband safar\Camera\IMG20230828131204.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828145339.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828132553.jpg

ঐতিহ্যের দহলিজে

সাহারানপুর থেকে দেওবন্দের সেই পুণ্যভূমিতে পৌঁছাতে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল। মাদ্রাসার ফটক দিয়ে প্রবেশ করেই সেই ঐতিহাসিক মুলসিরি (বকুল) বৃক্ষের তলে গিয়ে বসলাম। হারিয়ে গেলাম ভাবনার জগতে। এই তো আমাদের ঐতিহ্যের আঙ্গিনা। আমাদের শিক্ষার সূতিকাগার। স্বপ্নের ঠিকানা। ইলহামি প্রতিষ্ঠান। মকবুল ইদারা। আসলাফ ও আকাবিরের পবিত্র আমানত। এই তো নওদারা। নবীজির রেখাটানায় প্রতিষ্ঠিত বিল্ডিং। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম স্বপ্নযোগে মাওলানা রফিউদ্দিনকে এখানে ভিত্তিপ্রস্তরের জন্য বলেছিলেন। সামনে দারে জাদিদ। জগতবিখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি, হোসাইন আহমদ মাদানীর দরসগাহ। পেছনে সেই কূপ যেখান থেকে নবীজি সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালেবুল ইলদের পানি পান করিয়েছেন। পাশে থেকে মাওলানা রফিউদ্দিন (রহ.) তা অবলোকন করেছেন। তিনিই এই স্বপ্নের কথা অন্যদের শুনিয়েছেন। সেই থেকে এই কূপের কদর অনেক। এখনেও পানির পাইপ লাগিয়ে এই কূপের পানি পানের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা গিয়ে পান করে ধন্য হলাম। তারপর কাদিম মসজিদে নামাজ পড়ে দারুল হাদিসে গিয়ে বসলাম। রাত তখন ১১টা পার হয়েছে। তখনো অনেক ছাত্র কিতাব মুতালায় নিমগ্ন। বর্তমানে দারুল হাদিস শাইখুল হিন্দ লাইব্রেরির আন্ডারগ্রাউন্ডে। বিশাল বড় দরসগাহ। সেখানে আমাদের বাংলাদেশি কিছু ছাত্রের সাথে পরিচয় হল। তারা আমাদের থাকা ও মেহমানদারির ব্যবস্থা করেছে। তাদের সে আতিথ্যের কথা ভুলা যাবে না।

E:\deband safar\Camera\IMG20230828220813.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828221051.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230828230805.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829154122.jpg

‘মসজিদে রশিদ’ ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি

পরদিন ফজরের নামাজ আদায় করলাম শুভ্র মার্বেল পাথরে নির্মিত দৃষ্টি নন্দন ‘মসজিদে রশিদ’-এ। তাজমহল ও দিল্লির শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর অনুপম সমন্বয়ে তৈরি এই মসজিদ যেন শিল্প ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। ফজরের নামাজে ইমামের কন্ঠে সুমধুর কোরআন তেলাওয়াতে পেয়েছি স্বর্গীয় স্বাদ। তালেবুল ইলমদের শুভ্র কাফেলার সাথে নামাজ পড়তে পেরে অন্তরে অনুভব করলাম এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। মসজিদ থেকে বের হতেই ভোরের মৃদু হাওয়া আমাদের ছুঁয়ে গেল। বাতাসে ছিল শিশিরের ভেজা ¯িœগ্ধতা। এরপর আমরা গেলাম ‘মাকবারায়ে কাসেমীতে’ যেখানে শুয়ে আছেন দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসেম নানুতবি (রহ.) সহ বরেণ্য আকাবিরগণ।

এরপর ‘দারুল হাদিসে’ মাওলানা নেয়ামতুল্লাহ আজমি সাহেবের দরসে বসলাম। দারুল উলুমে তিনি বাহরুল উলুম (বিদ্যাসাগর) হিসেবে খ্যাত। দরস শেষে হুজুরের সাথে সাক্ষাত করে দোয়া নিলাম। তারপর গেলাম শায়খ আবদুল্লাহ মারুফি সাহেবের বাসায়। তিনি দারুল উলুমের উচ্চতর হাদিস বিভাগের প্রধান। আমাদেরকে তিনি স্নেহমাখা আতিথেয়তা, হাদিসের ইজাজত এবং কিতাব হাদিয়া দিয়ে ধন্য করেন।

E:\deband safar\Camera\IMG20230829082003.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829082138.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829110942.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829154132.jpg

E:\deband safar\Camera\IMG20230829060103.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829060321.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829064155.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829071810.jpg

E:\deband safar\Camera\IMG20230829080823.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829080437.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829201240.jpg
E:\deband safar\WhatsApp Images\IMG-20230830-WA0044.jpg

ওয়াকফে দেওবন্দ: এক বিনয়ী মহীরুহের সান্নিধ্য

দারুল উলুম দেওবন্দে অনাকাঙ্খিত এক ইনকিলাবের পরিপেক্ষিতে ১৯৮২ ইং সালে মাওলানা সালেম কাসেমি এবং মাওলানা আনযারশাহ কাশ্মিরি (রহ.) এর তত্ত্বাধানে এই প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম ওয়াকফে দেওবন্দ। আমরা নাস্তা খেয়ে সেখানে রওনা করি। পথে হাদিস স¤্রাট আনোয়ারশাহ কাশ্মিরি ও আনযারশাহ কাশ্মিরি (রহ.) এর মাকবারা জিয়ারত করি। মাদরাসায় প্রবেশ করে দেখি কাশ্মিরি (রহ.) এর নাতি মাওলানা খিজিরশাহ বোখারি শরিফের দরস দিচ্ছেন। আমরা দরসে বসলাম। দরস শেষে সাক্ষাত করলাম। কী অমায়িক ব্যবহার! আমি সে দৃশ্য কখনোই ভুলতে পারবো না। আমাকে এখনো সে দৃশ্য আবেগ তাড়িত করে। তিনি অনেক বড় ব্যক্তি। তাঁর পিতা,দাদা জগদ্বিখ্যাত হাদিসবিশারদ। তিনি হাজারো ছাত্রের সামনে আমার কাধে হাত রেখে রুম থেকে বের হলেন। হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামলেন। আমি লজ্জায় এতোটুকুন হয়ে গেলাম। টুকটাক কথা হল। বললাম, আপনার আব্বাকে বাংলাদেশে দু’বার দেখেছি। আপনার দাদাকে তো বিশ্ব চিনে। তাঁর ইলম দ্বারা জগত উপৃকত হচ্ছে। আপনার খান্দানকে অত্যন্ত ভালোবাসি। তিনি খুশি হলেন। আমাদের বাদ মাগরিব বাসায় দাওয়াত করলেন। শায়খের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা পুরো মাদরাসা ঘুরে দেখলাম। মাদরাসার প্রিন্সিপাল সুফিয়ান বিন সালিম কাসেমির রুমে সাক্ষাত করলাম। সালাম-মুসাহাফা শেষে বললাম, আপনার আব্বার চেহারার সাথে আপনার পুরোপুরি মিল রয়েছে। বাংলাদেশে হজরতকে দেখার এবং হাদিস পাঠ করার তৌফিক হয়েছে আমার। তিনি আমাদেরকে চা-নাস্তা আপ্যায়ন করালেন। আমরা তাঁর কাছে বুখারি শরিফ ১ম খন্ড থেকে একটি হাদিস পাঠ করে ইজাযত নিলাম।

E:\deband safar\Camera\IMG20230829101319.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829090744.jpg
E:\deband safar\WhatsApp Images\IMG-20230901-WA00111.jpg
E:\deband safar\WhatsApp Images\IMG-20230901-WA00061.jpg

রাসুলুল্লাহর (সা.) এর জুব্বার তাবাররুক ও কুতুবখানা

বিকেল ৩টায় আমাদের এক বিরল সৌভাগ্য হলো। ১৯১৩ সালে তুর্কি সুলতানের উপহার দেওয়া রাসুলুল্লাহর (সা.) জুব্বা মোবারকের স্পর্শধন্য সেই পবিত্র রুমালটি দেখার সুযোগ হলো। এটি দেখার সময় হৃদয়ে এক অভাবনীয় শিহরণ অনুভব করলাম।

এরপর প্রবেশ করলাম বিশাল কুতুবখানায়। যেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে বিরল সব কিতাব ও পা-ুলিপি। মাত্র দুই পৃষ্ঠায় সমগ্র কুরআন শরীফ দেখে আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। মনে হলো, আমি যেন জ্ঞানের এক অতল সাগরে নিমজ্জিত হয়েছি।

ছাত্তা মসজিদে আছরের নামাজ আদায় করলাম। এই সেই মসজিদ যেখানে ইমামতি করতেন হাজী আবিদ হোসাইন (রহ.)। যিনি ধ্যানে মগ্ন হলেই নবীজির জিয়ারতে ধন্য হতেন। একদিন ফজরের নামাজ শেষে জায়নামাজে ধ্যানে মগ্ন হন। সেখান থেকে ওঠে মাদরাসা করার অভিপ্রায়ে চাঁদা কালেকশন করেন। দিন শেষে ৩০০ রুপি উত্তোলন হয়ে যায়। তাঁর প্রচেষ্টায় এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজহারুল হিন্দ দারুল উলুম দেওবন্দ। এ মসজিদ পরিদর্শে ইতিহাসের সেই স্মৃতি চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাতে মুফতি সালমান মনসুরপুরী সাহেবের রুমে তিরমিজি শরিফ থেকে হাদিস পাঠ করি এবং শায়খের মেহমানদারি গ্রহণ করি।

E:\deband safar\Camera\IMG20230829163359.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230829161911.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG_20230901_174842.jpg

আকাবিরদের জনপদে: গঙ্গোহ থেকে নানুতা

৩০ আগস্টের এক সোনালী প্রভাত। স্নিগ্ধ ও শান্ত প্রকৃতিতে তখন কেবল সূর্যের লালিমার আভা। ‘রওয়াকে খালেদ’ ভবনের দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি শেষবারের মতো প্রাণভরে দেখে নিলাম আমার প্রিয় দারুল উলুমকে। হৃদয়ে এক অব্যক্ত বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠল। একটি ভিডিওতে সেই স্মৃতি বন্দী করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম এক নতুন অভিযানে, আকাবিরদের পূণ্যময় জনপদের উদ্দেশে।

আমাদের গাড়ি ছুটছে দুপাশে ছায়াঢাকা সবুজ বনানীর মধ্য দিয়ে। প্রথম গন্তব্য ‘গঙ্গোহ’। এই সেই পবিত্র মাটি, যা প্রসব করেছে কুতুবুল ইরশাদ রশীদ আহমদ গঙ্গোহী (রহ.), ফকিহুল উম্মত মাহমুদ গঙ্গোহী ও আব্দুল কুদ্দুস গঙ্গোহীর মতো বিশ্ববরেণ্য মনীষীদের। আমরা প্রথমে হযরত রশীদ আহমদ গঙ্গোহী (রহ.)-এর মাকবারা জিয়ারত করলাম। কী অনাড়ম্বর সেই শয়ানস্থল! নেই কোনো চাকচিক্য বা বিদআতের লেশ। কেবল একটি নামফলক জানান দিচ্ছে—এখানে শুয়ে আছেন এক যুগশ্রেষ্ঠ জ্ঞানতপস্বী। পাশে ‘দারুল উলুম’-এর শাখা মাদ্রাসাটি ইলমের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এরপর আমরা সুলতানুল আউলিয়া আব্দুল কুদ্দুস গঙ্গোহী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে থানাভনের দিকে রওনা হলাম।

E:\deband safar\Camera\IMG20230830081608.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230830082645.jpg
E:\deband safar\received_247292224380758.jpeg

থানাভন: আধ্যাত্মিকতার নিরাময় কেন্দ্র

নিকট অতীতের বুজুর্গদের মধ্যে যার জ্ঞান, হেকমত ও ফয়েজ দ্বারা উপমহাদেশের মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন তিনি আশরাফ আলী থানভি (রহ.)। তাঁর লিখিত কিতাব দ্বারা এখনো হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। বাংলাদেশ, ভারত,পাকিস্তানে তাঁর অসংখ্য খলিফা ও তাদের মুরিদান রয়েছেন। যামানার ওলামায়ে কেরাম তাঁকে যুগের মুজাদ্দিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা গাড়ি থেকে নেমে তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করেই একটি মসজিদ দেখতে পেলাম। মসজিদটি ছোট এবং খুবই সাদামাটা। পাশে একটি ছোট্ট মক্তব। একজন মিয়াজি শিশুদের পড়াচ্ছেন। তাঁর সাথে কথা বলে জানলাম এলাকাটি এখনো হিন্দু অধ্যুষিত। কিন্তু সবাই থানুভি (রহ.) কে অত্যন্ত সম্মান করেন। সে অঞ্চলে তাঁর নামে শতাধিক মকতব, মাদরাসা রয়েছে। কবর জিয়ারাহ করে বাড়িটি ঘুরে দেখলাম। খুবই সাদামাটা। ছাদবিহীন দেয়ালগুলো অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বুঝাই যাচ্ছে এখানে কেউ থাকে না। নিরব, নিস্তব্ধ ও জনমানবহীন। দুটি কবর পাশাপাশি। বিবিকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন শান্ত মাটির নিচে। মানুষের আনাগোনা নেই। শিরকি ও বেদআতি কর্ম নেই। চিহ্নস্বরূপ কবরে নেমপ্লেট পর্যন্ত নেই। সারা জীবন যিনি বেদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন মউতের পরও তার কবরটি সেই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত। তার বাড়ির অনতি দূরে আরো কবর। যারা শ্যামলির প্রান্থরে ইংরেজবিরোধী জিহাদে শহিদ হয়েছিলেন। হাফেজ যামেন ও হাফেজ আব্দুল্লাহ শহিদ (রহ.)। তাদের কবরে দোয়া কালাম পড়ে চলে গেলাম খানকাহে ইমদাদিয়া ও আশরাফুল উলুম মাদরাসায়। এখানেই যুগের মুজাদ্দিদ (রহ.) আধ্যত্মিক দীক্ষা নিয়েছেন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ. এর কাছে। এখনো তাঁর ইবাদতখানা সংরক্ষিত রয়েছে। খুবই ছোট। আমরা বরকত লাভের লক্ষ্যে সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর ইবাদতখানাসহ আরো অনেক বুজুর্গদের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে সেখানে। দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে সুন্দর সুন্দর বাণি সম্বলিত ফেস্টুন।

E:\deband safar\Camera\IMG20230830093511.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG_20230830_110107.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG_20230830_105338.jpg

নানুতা ও জালালাবাদের পথে

আমাদের কাফেলা পৌছাল নানুতায়। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতুভির এলাকা এটি। স্বর্ণপ্রসবা এই এলাকাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বহু বিখ্যাত আলেমের জন্মভূমি। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম শাইখুল হাদিস ইয়াকুব নানুতুভি (রহ.) এর মাকবারা এখানেই রয়েছে। রাস্তার পাশে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে জিয়ারাহ করলাম। এখানে নাম না জানা আরো কিছু কবর দেখতে পেলাম। মাকবারাটি দেয়াল বেষ্টিত সুন্দর পরিপাটি। রাস্তাও বেশ সুন্দর, প্রশস্ত। পাকা ঘরবাড়ি। বহুতল ভবনও রয়েছে অনেক। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এই জনপদটি দেখে মন জুড়িয়ে গেল। জালালাবাদ পৌঁছে গাড়ি থেকেই মসিহুল্লাহ খান রহ. এর মাদরসা দেখতে হল। মাওলানা মসিহুল্লাহ খান (রহ.) থানবি (রহ.) এর বিশিষ্ট খলিফা। বিজ্ঞ আলেম এবং তরিকতে শায়খ ছিলেন। আমাদের ইচ্ছে ছিল শামেলীর প্রান্তরের সেই ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখার, যেখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর শহীদরা শুয়ে আছেন, কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতা আমাদের সেই সুযোগ দিল না। এই সফর কেবল ভ্রমণের ছিল না, এটি ছিল শিকড়ের সন্ধানে এক আধ্যাত্মিক পথচলা। আকাবিরদের শূন্য ঘর, তাঁদের অনাড়ম্বর জীবন আর ইলমের প্রতি তাঁদের সেই নিঃস্বার্থ ত্যাগ দেখে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে এল। আধুনিক এই চাকচিক্যের যুগেও তাঁরা কীভাবে এত সাধারণ জীবন যাপন করে বিশ্বজয় করেছিলেন, তা ভেবে অবাক হই। তাঁদের সেই স্মৃতিগুলো হৃদয়ের অ্যালবামে চিরস্থায়ী করে আমরা ফেরার পথ ধরলাম।

বিদায়ের সুর ও দিল্লির রাজকীয় হাতছানি

কবির ভাষায়Ñ যেতে নাহি চাহে মন তবু যেতে হয়- প্রাণের স্পন্দন দারুল উলুমকে ছেড়ে আসার সময় হৃদয়ে ঠিক এই হাহাকারটুকুই অনুভব করছিলাম। যে আঙিনায় আত্মার প্রশান্তি মিলেছে, যেখানে প্রতিটি নিশ্বাসে রূহানিয়াতের ছোঁয়া পেয়েছি, সেখান থেকে বিদায় নেওয়া বড় কষ্টের। অতৃপ্ত হৃদয় আর সিক্ত নয়নে আমরা দেওবন্দ স্টেশন থেকে দিল্লির ট্রেন ধরলাম।

লাল কেল্লা: মুঘল শৌর্য ও আভিজাত্যের স্মারক

দিল্লি স্টেশনে নেমে একটি অটো নিয়ে আমরা যাত্রা করলাম ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদের পানে। কিছুদূর যেতেই দুচোখ ধাঁধিয়ে দিল লাল কেল্লার সেই সুদীর্ঘ প্রাচীর। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাল বেলেপাথরের দেয়াল যেন আজও মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতাপের কথা ঘোষণা করছে। সময়ের অভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারার আক্ষেপ রয়েই গেল। তবুও দূর থেকে দেখা সেই ‘দেওয়ানে আম’, ‘দেওয়ানে খাস’ আর ‘নহরের বেহেশত’-এর স্থাপত্যশৈলী কল্পনায় এক মায়াবী জগৎ তৈরি করছিল। কেল্লার দেয়ালে উৎকীর্ণ সেই অমর পঙ্ক্তিটি মনে পড়ে গেল—

“পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানে, তা এখানে, তা এখানে।”

C:\Users\Cp\Pictures\100.PNG
C:\Users\Cp\Pictures\101.PNG

শাহী জামে মসজিদ: স্থাপত্যের শিখরে আধ্যাত্মিকতা

অটো থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে যখন শাহী জামে মসজিদের চত্বরে দাঁড়ালাম, সামনে ভেসে উঠল মুঘল স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহান মসজিদটিকে এতটাই উচ্চতায় নির্মাণ করেছেন যে, এখান থেকে পুরো দিল্লি শহরটি একনজরে দেখে নেওয়া যায়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর ঘরের আজান যেন পুরো শহরের কোনায় কোনায় পৌঁছে যায়। শ্বেতপাথর আর লাল বেলেপাথরের অনন্য সংমিশ্রণে নির্মিত এই মসজিদটি যেন ভারতীয় ঐতিহ্যের এক সম্রাট-স্মারক। এর বিশাল চত্বরে একসঙ্গে ২৫ হাজার মুসল্লি সিজদাবনত হতে পারেন। তিনটি বিশালাকার গম্বুজ আর আকাশছোঁয়া দুটি মিনার দেখে মনে হয়, শিল্প আর ভক্তি এখানে একবিন্দুতে এসে মিশেছে।

মসজিদের উত্তর দিকের একটি প্রকোষ্ঠে সংরক্ষিত রয়েছে অত্যন্ত দুর্লভ ও পবিত্র কিছু নিদর্শন। হরিণের চামড়ায় লিখিত পবিত্র কুরআন মজীদ, রাসূলে পাকের (সা.) দাড়ি মোবারকের একটি চুল, তাঁর পাদুকা মোবারক এবং শ্বেতপাথরের ওপর তাঁর পদচিহ্ণ। এসব দেখে ভক্তিতে হৃদয় নুয়ে এল।

আমরা পূর্ব দিকের রাজকীয় তোরণ দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলাম। মাঝখানের বিশাল চত্বর পেরিয়ে হাউসে অজু করে যখন মূল প্রার্থনা কক্ষে জোহরের নামাজ আদায় করলাম, তখন এক অলৌকিক প্রশান্তি অনুভব করলাম। মসজিদের সাতটি মেহরাব আর স্বর্ণখচিত গম্বুজগুলো মুঘলদের রুচি ও আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।

সমাপ্তির বিষাদ

এক সময় এই জামে মসজিদ ছিল ভারতের স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই উৎসারিত হতো আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। আজ হয়তো সেই উত্তাল দিনগুলো নেই, কিন্তু এর প্রতিটি পাথর আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোহরের নামাজ শেষে যখন মসজিদ থেকে বিদায় নিলাম, তখন মনে হলো এই সফর কেবল ভূখ- দেখা নয়, এ যেন নিজের শেকড় আর অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

মেহেদিয়ান কবরস্থান: ইতিহাসের সমাধি ও হৃদয়ের রক্তক্ষরণ

দিল্লির ইতিহাস কেবল মুঘল সম্রাটদের শৌর্য-বীর্য দিয়ে ঘেরা নয়, বরং এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে একটি পুণ্যময় ‘ইলমি খানদান’। ব্রিটিশ তাড়াও আন্দোলনে যাদের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। সেই আন্দোলনের অগ্রসেনানী শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) এবং তাঁর সুযোগ্য সন্তান শাহ আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর ঐতিহাসিক ফতোয়ার মাধ্যমেই ভারতজুড়ে আযাদি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। দিল্লির উপকণ্ঠে ‘মেহেদিয়ান’ কবরস্থানে এই মহান মনীষীগণ চিরনিদ্রায় শায়িত।

মাদ্রাসায়ে রাহিমিয়া: ধুলিমলিন এক সোনালী অতীত

একটি সিএনজি ভাড়া করে আমরা যখন সেখানে পৌঁছালাম, তোরণ দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল একটি জরাজীর্ণ ভবন ‘মাদ্রাসায়ে রাহিমিয়া।’ শাহ ওয়ালিউল্লাহ’র পিতা শাহ আব্দুর রহিম (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার নাম শুনেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। যে প্রতিষ্ঠানের কথা ইতিহাসে অসংখ্যবার পড়েছি, আজ আমি সেই প্রতিষ্ঠানের সামনে। কিন্তু ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। একদা যেখানে ‘কালা কালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ ধ্বনিতে মুখরিত হতো, আজ সেখানে শ্মশানের নীরবতা। আহমদ আলী সাহারানপুরি, কাসেম নানুতুভি আর রশিদ আহমদ গঙ্গোহির মতো সূর্যসন্তানদের এই পাঠশালা আজ ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। ‘দরসে হাদিস’ লেখা ঘরটিতে গিয়ে দেখি, হাদিসের কিতাবগুলো অযতেœ স্তূপ হয়ে আছে। পুরো রুম ধূলিধূসরিত। নিখিল ভারতের প্রথম হাদিসের দরসগাহের এ অবস্থা দেখে হৃদয়টা চিন চিন করছে। এক সময়ের ছাত্রমুখর প্রাঙ্গণে ছাগল চড়তে দেখলাম। সময়ের এই নির্মম পরিহাস দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না।

E:\deband safar\Camera\IMG20230830163226.jpg

মুহাদ্দিসে দেহলভির শিয়রে: ভক্তি ও বিষাদের মিশ্রণ

বিমর্ষ চিত্তে আমরা এগিয়ে গেলাম কবরস্থানের দিকে। বিশাল এই প্রান্তরে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এর খানদানের সকল সদস্য একসাথে শুয়ে আছেন। তাঁদের উচ্চ মর্যাদার খাতিরে সমাধিগুলোর ওপর একটি ছাউনি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কবরের শিয়রে তাঁদের নাম ও মৃত্যুসন খোদাই করা। কিন্তু বড় ব্যথার বিষয় হলো, বেদাত ও কুসংস্কারের কালো ছায়া এই পবিত্র স্থানটিকেও গ্রাস করেছে। বড় বড় ডেক আর ওরসের আয়োজন দেখে বুঝতে পারলাম, এই মাকবারাটি এখন ভিন্ন ভাবাদর্শের মানুষের দখলে। ব্যথাতুর হৃদয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলাম।

E:\deband safar\Camera\IMG20230830162351.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230830162356.jpg
E:\deband safar\Camera\IMG20230830162520.jpg

দিল্লির বিদায় ও আধুনিকতার ছোঁয়া

দিল্লি থেকে কলকাতার ফিরতি টিকিট আমাদের আগেই কাটা ছিল। মেট্রো রেল যোগে আমরা পৌঁছে গেলাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বিমানবন্দর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এর বিশালতা, স্থাপত্যশৈলী, পরিচ্ছন্নতা আর আধুনিকতার ছোঁয়া সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। সারা দিনের ক্লান্তি, দীর্ঘ সফর আর হৃদয়ের ভারাক্রান্ত অনুভূতি নিয়ে যখন বিমানের সিটে বসলাম, তখন দু’চোখে নেমে এলো গভীর তন্দ্রা। বিমানে বসে ঘুমের ঘোরে হয়তো সেই সোনালী ইতিহাসের স্বপ্নই দেখছিলাম।

কলকাতার রাজপথে: এক অদ্ভুত মধ্যরাত

কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করতেই উষ্ম আবহাওয়ার ঝাপটা আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। রাত তখন বারোটা পেরিয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে নামাঙ্কিত এই বিমানবন্দরটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমল আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস। শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে দমদমের এই আধুনিক আঙিনা ছেড়ে আমরা ট্যাক্সিযোগে পা বাড়ালাম মূল শহরের দিকে।

আমাদের শরীর তখন অবসাদে ভেঙে পড়ছে। সেই ভোরে দেওবন্দ ছাড়ার পর পেটে দানাপানি জোটেনি বললেই চলে। ক্ষুধার জ্বালায় শহর জুড়ে হোটেলের খোঁজ শুরু হলো, কিন্তু প্রায় সব বিপণিবিতান আর সরাইখানা তখন নিদ্রামগ্ন। অবশেষে একটি হোটেল পাওয়া গেল যারা বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ক্ষুধার্ত আমাদের কাছে তখন সাধারণ অন্ন আর গোমাংসের স্বাদ অমৃতের মতো ঠেকল।

নাখোদা মসজিদের দ্বারে: ফুটপাতে এক রাত্রি

আহার শেষ হলো, এবার প্রয়োজন শ্রান্ত দেহটা এলিয়ে দেওয়ার মতো এক চিলতে জায়গা। কলকাতার ফুটপাতে অগণিত মানুষকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখে অবাক হচ্ছিলাম। কে জানত, বিধাতা আমাদের কপালে আজ এমন এক অভিজ্ঞতাই লিখে রেখেছেন! জাকারিয়া স্ট্রিটের মুসাফিরখানায় গিয়ে দেখলাম ফটকে তালা ঝুলছে এখানে রাত ১১টার পর প্রবেশের নিয়ম নেই।

আমীর সাহেব প্রস্তাব করলেন, কাছেই ‘নাখোদা মসজিদ’। খোদার ঘরের নাম ‘নাখোদা’ নামটি শুনে মনে কৌতূহল জাগলেও তখন ভাববার শক্তি ছিল না। সেখানে পৌঁছেও দেখি নিস্তব্ধতা আর তালাবদ্ধ তোরণ। ভেতরে একজনকে ঘুমন্ত দেখে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া মিলল না। রাত তখন ঘড়ির কাঁটায় দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই। আমীর সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, “বাকি রাতটুকু এখানেই কাটিয়ে দেই।”

আকাশের নিচে প্রশান্তির ঘুম

ফুটপাতে রাত্রিযাপন? আমার মন প্রথমে সায় দিচ্ছিল না। হোটেলে যাওয়ার প্রস্তাব করলাম, কিন্তু সঙ্গীরা বললেন, রাত তো আর বেশি বাকি নেই, তার ওপর এশার নামাজও পড়া হয়নি। অবশেষে ক্লান্তির কাছে হার মানলাম। পিচঢালা পথের একপাশে শরীরটা এলিয়ে দিতেই চারপাশের কোলাহল ধুয়ে-মুছে গেল। নাখোদা মসজিদের সেই বিশাল ফটকের সামনে, আকাশের নিচে ফুটপাতে শুয়ে যে গভীর আর প্রশান্তির ঘুম আমি ঘুমালাম, তা হয়তো মখমলের বিছানাতেও পাওয়া দুষ্কর। আল্লাহর ঘরের দুয়ারে এক নিঃস্ব মুসাফিরের মতো সেই রাতটি আমার স্মৃতির পাতায় চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে।

শেষ বেলা: তিলোত্তমার ধূসর রূপ

৩১ আগস্ট, ২০২৩। ভারতের মাটিতে আমাদের সফরের শেষ সূর্যোদয়। পরিকল্পনা ছিল শেষ দিনটি কলকাতার তিলোত্তমা রূপ দেখে আর কেনাকাটা করে কাটাব। জাকারিয়া স্ট্রিট মসজিদে ফজরের নামাজ শেষ করে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি মেটাতে এক পশলা ঘুম দিয়ে নিলাম। এরপর নাশতা সেরে যখন শহরের অলি-গলিতে পা রাখলাম, তখন এক মিশ্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম।

শৈশব থেকে শুনে আসা সেই ‘তিলোত্তমা’ কলকাতা যেন আজ কিছুটা বিবর্ণ। রাস্তার জঞ্জাল, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর ফুটপাতে মানুষের অগোছালো জীবনযাপন দেখে মনের গহিনে লালিত সেই রঙিন ছবিটি কিছুটা ফিকে হয়ে গেল। বাজারের ঘিঞ্জি পরিবেশ আর সরু গলির মধ্য দিয়ে চলাফেরা করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। তবে একটি বিষয় আমাদের অবাক করেছেÑ তা হলো এখানকার পণ্যের সহজলভ্যতা ও সস্তা দর। আমরা সবাই মন ভরে নিজেদের পছন্দের কিছু সওদা করে নিলাম।

তীব্র দাবদাহে যখন আমরা সিদ্ধ হচ্ছিলাম, ঠিক তখনই মরুভূমিতে সুশীতল বারিধারার মতো এক পশলা বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল শহরের ধুলো আর আমাদের ক্লান্তি। এরপর শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে চেপে বনগাঁ হয়ে যখন মাতৃভূমি বাংলাদেশের সীমানায় পা রাখলাম, তখন দিনের সূর্যটি পাটে বসছে। বিকেলের সেই ম্লান আলোয় মনে হলো, পরবাসের শত চাকচিক্য আর ঐতিহাসিক গরিমা থাকলেও দিনশেষে নিজের দেশের মাটির গন্ধই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুগন্ধ।

উপসংহার: হৃদয়ের মণিকোঠায় এক টুকরো ভারত

এই সফর কেবল এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাত্রা ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের ধুলোমাখা পথ বেয়ে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে চেনার এক অনন্য অভিযাত্রা। দেওবন্দের আধ্যাত্মিক সুধা, সাহারানপুরের ইলমি আবেশ, দিল্লির রাজকীয় শৌর্য আর কলকাতার তিলোত্তমা রূপ সব মিলিয়ে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ফিরলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!