1
1
নির্বাচন এলে একটি কথা মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়—‘আমার ভোট আমি দেব যাকে ইচ্ছা তাকে দেব।’ আপনার ভোট আপনি দেবেন, তবে একজন বিবেকবান ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাকে প্রার্থী যাচাই-বাছাই করে ভোট দেওয়া উচিত। প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারিতা দেখে ভোট দেওয়া ভোটারের কর্তব্য। আপনার ভোট এতো মূল্যহীন নয় যে, আপনি যাকে তাকে দিয়ে দেবেন। বরং আপনার ভোটের মূল্য ও গুরুত্ব অনেক। তাইতো নির্বাচনের সময় ভোটারদের কদর বেড়ে যায়। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে। আপনি যদি মনে করেন, আমার একটি ভোটের দ্বারা কী আসে যায়? তাহলে এই চিন্তা ভুল হবে। কেননা, এটা সবারই জানা যে, প্রচলিত গণতন্ত্রে একটি ভোটের গুরুত্ব অনেক বেশি। যখন ভালো-মন্দ, যোগ্য-অযোগ্য উভয় প্রার্থী সমান ভোট পায় তখন আপনার একটি ভোট পুরো জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। সুতরাং একজন ভোটার বা একটি ভোট নির্বাচনে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক দেশে যেহেতু ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় তাই প্রত্যেক ভোটারকে ভেবে-চিন্তে ভোট প্রদান করতে হবে। কোনো অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত, খারাপ চরিত্রের ব্যক্তির হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া মারাত্মক অন্যায়। একইভাবে টাকার বিনিময়ে বা অন্য কোনো পার্থিব কারণে ভোট বিক্রি করাও অপরাধ। এ ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে তা আমাদের জানতে হবে।
দ্বিতীয়ত: ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের তিনটি অবস্থা। তা হলো—
১. সাক্ষ্য প্রদান।
২. সুপারিশ।
৩. ওকালতি।
এই তিনটি বিষয় পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর আলোকে স্পষ্ট বক্তব্য ও দলিলসহ তুলে ধরছি।
১. সাক্ষ্য প্রদান:
কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ, তার ব্যাপারে এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আমার দৃষ্টিতে লোকটি সৎ ও যোগ্য। বাস্তবে সে যদি সৎ ও যোগ্য না হয় তাহলে তাকে ভোট দিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন— ‘সবচেয়ে মারাত্মক কবিরা গোনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ বর্ণিত আছে, এই হাদিসটি বর্ণনার সময় নবীজি (সা.) হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় পাপটি বলার সময় তিনি হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘শোনো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া অনেক বড় গোনাহ।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৫৪)
মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান যেমন মারাত্মক অন্যায় তেমনি সাক্ষ্য গোপন করা বা প্রয়োজনের সময় সাক্ষ্য না দেওয়াও গোনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ
‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। আর যে সাক্ষ্য গোপন করে তার অন্তর গোনাহগার।’ (সূরা বাকারা: ২৮৩)
বরং ইসলাহ প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য সাক্ষ্য প্রদান করা অপরিহার্য। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্যদান কর, যদিও সে সাক্ষ্য তোমাদের বিরুদ্ধে যায়, কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়-স্বজনের বিপরীতে চলে যায়।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)
অন্য আয়াতে বলেছেন—
وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ
‘অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য প্রদান কর।’ (সুরা তালাক: ১)
হাদিসে নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, কাউকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ডাকা হলে সে যদি তা গোপন করে তবে তা মিথ্যাসাক্ষ্যের ন্যায় হবে।’ (তাবরানি: ২৭০)
২. সুপারিশ:
নির্বাচনে প্রার্থীকে ভোট প্রদানের আরেকটি দিক হচ্ছে শাফাআত বা সুপারিশ। ভোটদাতা যেন সুপারিশ করছে—আমার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হোক। সে-ই জনপ্রতিনিধি হওয়ার অধিক যোগ্য বলে মনে হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে মূলনীতি পেশ করেছেন। তিনি এরশাদ করেন—
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا ۖ وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا
‘যে ব্যক্তি উত্তম ও সৎ সুপারিশ করবে সে এর অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি মন্দ ও মিথ্যা সুপারিশ করবে সে তার বোঝা বহন করবে।’ (সুরা নিসা: ৮৫)
আয়াত থেকে বুঝা গেল, সৎকর্ম ও সৎকাজের পক্ষে সুপারিশ করলে নেকি আর অসৎকাজ ও অসৎকর্মের পক্ষে সুপারিশ করলে গোনাহের ভাগি হবে। আমাদের ভোটে নির্বাচিত প্রার্থী জনগণের সঠিক ভালো-মন্দ যা কিছু করবে তা আমাদের আমলনামায় যুক্ত হবে এবং তাতে শরিক গণ্য হবে।
৩. ওকালতি:
ভোটের আরেকটি দিক হচ্ছে ওকালতি তথা প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান। অর্থাৎ আপনার ভোট পেয়ে প্রার্থী জনগণের প্রতিনিধি মনোনীত হয়। সুতরাং নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্মজীবনে জনগণের পক্ষে যা কিছু করবে তার গোনাহের একটি অংশ ভোটদাতাও বহন করবে। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত কাজের জন্য কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগ করলে তার সবকিছু যাচাই-বাছাই করি। আর জাতীয় নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি একজন ভোটারের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং পুরো জাতির সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এখানে প্রতিনিধি যাচাই-বাছাইয়ে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
তা ছাড়া ভোট একটি পবিত্র আমানত। এই আমানতকে যথাযথ স্থানে না রাখলে খেয়ানতের গোনাহ হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতকে তার যোগ্য হকদার ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)
অতএব, যাকে ইচ্ছা তাকে নয়, বরং সৎ, নির্ভীক, আমানতদার, যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।
ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা কাম্য নয়। ভোট না দেওয়া সাক্ষ্য গোপন করার অন্তর্ভুক্ত। আর প্রয়োজনের সময় সাক্ষ্য গোপন করা হারাম। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আপনার কাছে তলব করা হচ্ছে, আপনার অঞ্চলে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মধ্যে আপনার দৃষ্টিতে দ্বীনদারিতা, আমানতদারিতা, সততা, নিষ্ঠা, দেশ ও জাতির কল্যাণকামিতার দিক থেকে কে সর্বোত্তম? এই অবস্থায় সাক্ষ্য গোপন করা জায়েজ নেই। এই পরিস্থিতিতে আপনার উপর ভোট দেওয়া আবশ্যক। মুসলিম শরিফের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে উত্তম সাক্ষী দানকারীদের সম্পর্কে বলব না? যে ব্যক্তি তার কাছে সাক্ষ্য তলব করার পূর্বেই সাক্ষ্য প্রদান করে।’ (মুসলিম শরিফ: ১৭১৯)
অনেকে চলমান রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ভোটের সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে চান। তাদের এই ধ্যান-ধারণা একদিকে থেকে সঠিক মনে হলেও এর পরিণাম ভয়াবহ। কারণ, ভালো মানুষ যদি ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে তখন খারাপ মানুষের ভোট প্রাধান্য পাবে। মন্দচরিত্রের লোক জনপ্রতিনিধি হবে। তখন তো এ ময়দান চিরদিন খারাপই থেকে যাবে। এই খারাপি গ্রাস করবে সমগ্র জাতিকে। তাই সৎ, আমানতদার ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এখানে একটি আপত্তি আসতে পারে। তা হলো, বর্তমানে যারা নির্বাচনে দাঁড়ায় তাদের অধিকাংশই বেহীন বা ধর্মপরায়ণ নয়। সুতরাং কাকে ভোট দেব? এর জবাব হলো, বর্তমানে শতভাগ ভালো মানুষ পাওয়া মুশকিল। তাই এক্ষেত্রে শরিয়তে এই মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। তা হচ্ছে—
اذا ابتليتم فاختاروا أهون الشرين
অর্থাৎ যখন তোমার সামনে দুটি মন্দ দিক থাকে তখন তুলনামূলক হালকা মন্দকে গ্রহণ কর। এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রার্থীদের মধ্যে যাকে তুলনামূলক ভালো মনে হবে তার পক্ষেই ভোট দিতে হবে। মোটকথা, প্রত্যেককে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার কারণে যদি অযোগ্য লোক নির্বাচিত হয় তাহলে এর দায়ভার তার ওপর বর্তাবে। বরং সমগ্র জাতির যে ক্ষতি হবে এর জন্যও সে দায়ী হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং সঠিকভাবে সাক্ষ্যপ্রদানের তাওফিক দান করুন।