1
1
স্টাফ রিপোর্টার, জামালপুর | ২৩ মার্চ, ২০২৬
জামালপুরের মোহনগঞ্জ মহাকুমার (তৎকালীন ব্রিটিশ কাচারীভুক্ত) অন্তর্গত উমানাথ চক্রবর্তী কাচারির পৈত্রিক জমি নিয়ে শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক জালিয়াতি, অতিরিক্ত জমি বিক্রি এবং জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে।
শত বছরের সিএস রেকর্ড অনুযায়ী জমির প্রকৃত মালিকদের ওয়ারিশরা বর্তমানে নিজেদের জমি হারিয়ে প্রশাসনিক দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে জমি দখলের চেষ্টায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মূল ঘটনার সূত্রপাত ও রেকর্ডের গরমিল
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিএস খতিয়ান নং ১৫০ এবং দাগ নং ৪০০, ৩৭০, ৩৭১ ও ৩৭২-এর মোট জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ঘাঠু শেখ ও হাটু শেখ গং। পরবর্তীতে এই জমি বৈধ দলিলের (নং ৯২২৭) মাধ্যমে মো. কান্দু শেখ ক্রয় করেন। তার উত্তরাধিকারী জালাল উদ্দিন মন্ডল ও ইদ্রিস আলী মন্ডল গং দীর্ঘকাল ধরে প্রায় ৬০ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসছেন।
বিপত্তি বাধে ২০১৮ সালে খারিজ (Mutation) করতে গিয়ে। ভূমি অফিস জানায়, আরএস (ROR) ও বিএস (BRS) রেকর্ডে মূল মালিকদের নাম বাদ পড়ে শ্যাম লাল মাল্লা ও সুরেশ চন্দ্র পালের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মালিকানার এই ধারাবাহিকতা বিচ্যুতিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জালিয়াতি হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগীরা।
অতিরিক্ত জমি বিক্রির ‘ম্যাজিক’ ও আইনি অসংগতি
প্রতিবেদনে উঠে আসা সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো শ্যাম লাল মাল্লার জমি বিক্রি। আরএস রেকর্ড অনুযায়ী শ্যাম লাল মাল্লা পেয়েছিলেন মাত্র ৪৭ শতাংশ জমি। অথচ:
১৯৬৪ সালে তিনি বিদ্যালয়ের নিকট ৩৩ শতাংশ জমি বিক্রি করেন।
১৯৭৯ সালে তার পুত্র ইন্দ্র লাল মাল্লা একই দাগে ১ একর ১.৪৬ শতাংশ (প্রায় ১০১ শতাংশ) জমি বিদ্যালয়ের নামে সাব-কবলা করেন।
প্রশ্ন উঠেছে, বাবার মালিকানায় যেখানে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ জমি, সেখানে পুত্র কীভাবে এক একরের বেশি জমি বিক্রি করলেন? এই অতিরিক্ত ১৩২ শতাংশ জমির উৎস কোথায়? এটি কি সুস্পষ্ট জালিয়াতি নয়—এমন প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে।
দলিল ছাড়াই বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ!
অভিযোগ উঠেছে, সিএস খতিয়ান নং ১৫০-এর দাগ নং ৪০০-এর ৮১ শতাংশ জমির উপর বর্তমানে শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই জমির স্বপক্ষে বিদ্যালয়ের কোনো বৈধ দলিল নেই বলে দাবি করেছেন ইদ্রিস আলী মন্ডল। বৈধ অধিগ্রহণ বা দানপত্র ছাড়াই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বিদ্যালয়ের এই অবস্থানকে ‘অবৈধ দখল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
আদালত অবমাননা ও হুমকির অভিযোগ:
বর্তমানে জমিটি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন (মামলা নং ৭২৬/২০২১)। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে সম্প্রতি স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিদ্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাধা দিতে গেলে প্রকৃত মালিকদের প্রাণনাশের হুমকি ও মানহানি করা হচ্ছে বলে ইদ্রিস আলী মন্ডল অভিযোগ করেছেন।
প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি:
ভুক্তভোগী ইদ্রিস আলী মন্ডল জানান, তাদের কাছে মালিকানার স্বপক্ষে ৮০ পৃষ্ঠারও বেশি অকাট্য দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু রেকর্ডের ভুল আর জালিয়াতির সুযোগ নিয়ে আমাদের পৈত্রিক ভিটা দখল করা হচ্ছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও জীবনের নিরাপত্তা চাই।”
বিশেষজ্ঞ অভিমত: ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মালিকানার অতিরিক্ত জমি বিক্রির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সিএস রেকর্ডের সাথে আরএস ও বিএস-এর এই বিশাল গরমিল দূর করতে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত এবং দাগ-রেকর্ডের সমন্বিত যাচাই জরুরি।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে এমন জালিয়াতির অভিযোগ শিক্ষা ও আইনের শাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ এই জটিলতা নিরসনে কী ভূমিকা রাখে।